চিন্ময়ের জামিন নাটকীয়তা—জামিন, স্থগিত, ফের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার

চিন্ময়ের জামিন নাটকীয়তা—জামিন, স্থগিত, ফের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী: ৩০ এপ্রিল, রাত ৮:৩০ মিনিট

চট্টগ্রামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন নিয়ে তৈরি হয়েছে এক নাটকীয় পরিস্থিতি। মঙ্গলবার দুপুরে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ থেকে তাকে জামিন দেওয়া হলেও রাত আটটা ৩০ মিনিটে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই জামিন স্থগিত করে। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়, এবং বিষয়টি পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী রবিবার পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়েছে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কে?

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস (আসল নাম: চন্দন কুমার ধর) একজন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সন্ন্যাসী এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে সক্রিয় একটি জোট—বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র। পূর্বে তিনি ইস্কন বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন, তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও কিছু গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে।

ইস্কন থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি নিজ উদ্যোগে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় মাঠে নামেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে আট দফা দাবি উত্থাপন করে তার নেতৃত্বাধীন সংগঠন, যার মধ্যে ছিল সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন, দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল এবং একটি পৃথক সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি।


মামলার পটভূমি

২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা এক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় চিন্ময় ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ওপরে একটি ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করে ‘জাতীয় মর্যাদাকে অপমান’ করেছে। মামলাটি করেন বিএনপির চট্টগ্রাম মহানগরের তৎকালীন এক নেতা ফিরোজ খান, যাকে পরবর্তীতে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চিন্ময়ের জামিন আবেদন চট্টগ্রামের সেশন কোর্ট থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং তিনি কারাবন্দি থাকেন।


আদালতের চলমান অবস্থান

  • হাইকোর্টের আদেশ (৩০ এপ্রিল, দুপুর): বিচারপতি মো. আতওয়ার রহমান এবং বিচারপতি মো. আলী রেজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ চিন্ময়কে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করে।
  • আপিল বিভাগে স্থগিতাদেশ (৩০ এপ্রিল, রাত ৮:৩০): রাষ্ট্রপক্ষ জামিন স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে, এবং সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জামিন স্থগিত করে আদেশ দেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।
  • পরবর্তী শুনানি: আগামী রবিবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এই বিষয়ে চূড়ান্ত শুনানি হবে।

আইনজীবীদের বক্তব্য

  • রাষ্ট্রপক্ষ: অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরিদ উদ্দিন খান দাবি করেন, একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় হাইকোর্ট যথাযথ বিচার না করেই জামিন দিয়েছে।
  • চিন্ময়ের পক্ষে: সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না, প্রবীর হালদার ও অপুর্ব ভট্টাচার্য আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন যে, চিন্ময় গুরুতর অসুস্থ এবং তার বক্তব্য ছিল শান্তিপূর্ণ। দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখা তার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করছে।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব

চিন্ময়ের গ্রেপ্তারের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করে। নভেম্বর মাসে আদালতের প্রাঙ্গণে সংঘর্ষে একজন আইনজীবী নিহত হন। এই ঘটনাগুলো দেশজুড়ে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ভারতের কিছু মহল থেকেও এই মামলার প্রতি কূটনৈতিক নজর রাখা হচ্ছে, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে সংখ্যালঘুদের কণ্ঠরোধে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *