বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারি জনগোষ্ঠী: অত্যাচারের ইতিহাস, নাগরিকত্বের বিভ্রান্তি ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বিহারি জনগোষ্ঠী একটি বিতর্কিত ও সংবেদনশীল অধ্যায়। উর্দুভাষী এই জনগোষ্ঠী ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) এসে বসতি স্থাপন করে। তবে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে বাঙালিদের উপর নৃশংস অত্যাচার চালায়। এই ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতার কারণে স্বাধীনতার পর তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ও বিভ্রান্তি চলে। ২০০৮ সালের ১৯ মে বাংলাদেশ হাইকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে বিহারিদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রদান করা হয়। এর ফলে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার লাভ করে। তবে, এই আইনি স্বীকৃতি তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারেনি কারণ তাদের বড় অংশ নিজেদেরকে এখনো পাকিস্তানী মনে করেন ।বিপরীতে, পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিরা এখনও নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে বিহারিরা ক্যাম্পে বসবাস করছে, সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তানপন্থী ধারণা পোষণ করে।

ঐতিহাসিক পটভূমি :

বিহারি জনগোষ্ঠী মূলত উত্তর ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত উর্দুভাষী মুসলিম। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় তারা ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে চলে আসে। পূর্ব পাকিস্তানে এসে তারা শিল্প, বাণিজ্য ও সরকারি চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, তাদের উর্দুভাষী পরিচয় এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি অনীহা তাদের স্থানীয় জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় বিহারিদের একটি অংশ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সমর্থন করে, যা বাঙালিদের মধ্যে তাদের প্রতি অবিশ্বাস বাড়ায়। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসনের সময় বিহারিরা প্রায়শই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করে, যা তাদের বাঙালি জনগণের কাছে আরও অপ্রিয় করে তোলে। তবে, তাদের প্রকৃত ভূমিকা স্পষ্ট হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়।

১৯৭১ সালে বিহারিদের দ্বারা বাঙ্গালীদের অত্যাচার :

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিহারি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা করে বাঙালিদের উপর নৃশংস অত্যাচার চালায়। এই অত্যাচারের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক নিম্নরূপ:

১. গণহত্যায় সহযোগিতা: বিহারিরা পাকিস্তানি সেনাদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে। তারা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ নাগরিকদের বাড়ি চিহ্নিত করে সেনাদের কাছে তথ্য সরবরাহ করত। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় বিহারি-অধ্যুষিত ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের ধরে নিয়ে গণহত্যা চালায়। মিরপুরে বিহারিরা স্থানীয় বাঙালিদের তালিকা তৈরি করে সেনাদের হাতে তুলে দেয়, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়।

২. সহিংসতায় সরাসরি অংশগ্রহণ: বিহারিরা শুধু তথ্য সরবরাহেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা সরাসরি সহিংসতায় জড়িত ছিল। তারা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিলে “আল-বদর” ও “আল-শামস” নামে কুখ্যাত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়। এই বাহিনীগুলো বাঙালি বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে বিহারিদের ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট।

৩. নারী নির্যাতন: পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি নারীদের উপর যে ব্যাপক ধর্ষণ ও নির্যাতন চালায়, তাতে বিহারিরা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তারা নারীদের চিহ্নিত করে সেনাদের কাছে তুলে দিত এবং কিছু ক্ষেত্রে নিজেরাও এই অপরাধে জড়িত হত।

৪. সম্পত্তি লুণ্ঠন: বিহারিরা বাঙালিদের পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘর দখল করে এবং তাদের সম্পত্তি লুণ্ঠন করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বাঙালি পরিবার পালিয়ে গেলে বিহারিরা তাদের সম্পত্তি দখল করে নেয়, যা যুদ্ধের পর তাদের প্রতি ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

৫. স্থানীয় বিশ্বাসঘাতকতা: বিহারিরা বাঙালি প্রতিবেশীদের সঙ্গে বছরের পর বছর একসঙ্গে বসবাস করলেও যুদ্ধের সময় তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এই বিশ্বাসঘাতকতা বাঙালি জনগণের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, সৈয়দপুরে বিহারিরা বাঙালি ব্যবসায়ীদের দোকান লুট করে এবং পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিলে হত্যাকাণ্ড চালায়। মুক্তিযুদ্ধে বিহারিদের এই ভূমিকার ফলে স্বাধীনতার পর তাদের “স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অনেকে পাকিস্তানে ফিরে যেতে চাইলেও পাকিস্তান সরকার তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তারা বাংলাদেশে আটকে পড়ে এবং ক্যাম্পে বসবাস শুরু করে।

পাকিস্তানে বাঙালি বনাম বাংলাদেশে বিহারি: একটি তুলনা

পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিরা এখনও নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা প্রায় ২ লাখের মতো এবং বেশিরভাগই করাচিতে বসবাস করে। ১৯৭১-এর পর পাকিস্তান সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যদিও তারা পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছে এবং সেখানেই বড় হয়েছে। তাদের অবস্থা বাংলাদেশের বিহারিদের তুলনায় অনেক খারাপ। তারা কোনো আইনি স্বীকৃতি পায়নি এবং সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার।। বাংলাদেশের বিহারিরা ২০০৮ সালে হাইকোর্টের রায়ে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার পেয়েছে, যার ফলে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার বিহারি ভোটার নিবন্ধিত হয়েছে, যা তাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের অধিকার দেয়। যদিও তারা ক্যাম্পে বসবাস করে এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার, তবুও তাদের আইনি স্বীকৃতি তাদের জীবনে একটি নির্দিষ্ট মর্যাদা এনেছে। উদাহরণস্বরূপ, তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ পেলেও, এটি তাদের পাকিস্তানের বাঙালিদের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে রাখে। অন্যদিকে, পাকিস্তানে প্রায় ২ লাখ বাঙালি, যাদের বেশিরভাগ করাচিতে বসবাস করে, এখনও নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত। “দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল” (২০১৮)-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাঙালিরা অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে বাস করে, ন্যূনতম মজুরিতে কঠোর পরিশ্রম করে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কোনো সুযোগ নেই। তাদের কোনো আইনি পরিচয় না থাকায় তারা ভোট দিতে পারে না, সম্পত্তি কিনতে পারে না এবং সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত। “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ” (২০২০)-এর রিপোর্টে উল্লেখ আছে, পাকিস্তান সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যদিও তারা সেখানে জন্মগ্রহণ করেছে। এই বাঙালিরা প্রায়শই পুলিশি হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হয়, এবং তাদের জীবন মানবেতর। উদাহরণস্বরূপ, করাচির মাচ্ছার কলোনির বাঙালি শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না, কারণ তাদের জন্ম সনদ নেই। বিপরীতে, বাংলাদেশের বিহারিরা ক্যাম্পে থাকলেও নাগরিকত্বের কারণে সন্তানদের জন্য জন্ম সনদ ও সীমিত শিক্ষার সুযোগ পায়। পাকিস্তানের বাঙালিদের তুলনায় বিহারিদের এই আইনি মর্যাদা তাদের জীবনযাত্রায় একটি স্পষ্ট সুবিধা এনে দিয়েছে, যদিও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে তারা এখনও পিছিয়ে আছে। তবুও, নাগরিকত্বের অভাবে পাকিস্তানের বাঙালিদের দুঃখ-কষ্ট বাংলাদেশের বিহারিদের তুলনায় অনেক গভীর।

নাগরিকত্বের আইনি যাত্রা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই বিহারিদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে বলে যে, যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে বাংলাদেশে বসবাস করছিলেন, তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য উপযুক্ত। এই রায়ের ভিত্তিতে বিহারিরা আইনত নাগরিকত্ব দাবি করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তাদের নাগরিকত্ব প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতা ও সামাজিক বিরোধিতার কারণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে কিছু বিহারিকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে, মাত্র ১ লাখের কিছু বেশি বিহারি পাকিস্তানে যেতে পারে। বাকিরা বাংলাদেশে থেকে যায় এবং তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় থাকে। ২০০৩ সালে আবুল হাসান নামে এক বিহারি যুবকের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রায় দেয় যে, ১৯৭১-এর পর জন্মগ্রহণকারী বিহারিরা বাংলাদেশের নাগরিক। এই রায় একটি পথ প্রদর্শন করে। অবশেষে, ২০০৮ সালের ১৯ মে হাইকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে সকল বিহারিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়ের ফলে বিহারিরা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার লাভ করে। বর্তমানে, বাংলাদেশে বসবাসরত বিহারিদের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ভোটার নিবন্ধিত হয়েছে। তবে, এই আইনি স্বীকৃতি তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে তেমন ভূমিকা রাখেনি।

পাকিস্তানপন্থী মনোভাব ও বিভেদ :

বিহারি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাকিস্তানপন্থী ধারণা এখনও বেশ শক্তিশালী। অনেক বিহারি বাংলাদেশকে তাদের “স্থায়ী বাড়ি” হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তারা পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং পাকিস্তানকে তাদের “আসল মাতৃভূমি” হিসেবে বিবেচনা করে। এই মনোভাব ক্যাম্পের ভেতরে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। যেসব বিহারি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে এবং এখানকার সমাজে মিশে যেতে চায়, তাদের প্রতি পাকিস্তানপন্থীরা বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। এই পাকিস্তানপন্থী ধারণা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে একটি সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে বিহারিদের ভূমিকা ছিল বাঙালি জাতির জন্য একটি ক্ষত। এই ঐতিহাসিক সত্যের আলোকে বিহারিদের পাকিস্তানপন্থী মনোভাবকে অনেকে “বিশ্বাসঘাতকতার ধারাবাহিকতা” হিসেবে দেখে। ফলে, তাদের প্রতি সম্মান বা সহানুভূতি দেখানোর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। তবে, নতুন প্রজন্মের বিহারিদের মধ্যে একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে, বাংলা ভাষা শিখেছে এবং এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত। অনেকে নিজেদের “গর্বিত বাংলাদেশি” হিসেবে পরিচয় দিতে চায়। কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষের কর্মকাণ্ড এবং ক্যাম্পের পাকিস্তানপন্থী পরিবেশ তাদের এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য :

বাংলাদেশে বিহারি জনগোষ্ঠী প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখের মতো। তাদের বেশিরভাগই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, রংপুর ও ময়মনসিংহের মতো শহরে ক্যাম্পে বসবাস করে। এই ক্যাম্পগুলো অস্বাস্থ্যকর, জনাকীর্ণ এবং মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিহারিরা সাধারণত নিম্নমানের কাজ যেমন দিনমজুরি, কসাইয়ের কাজ, রিকশা চালানো বা ছোটখাটো ব্যবসায় জড়িত। তাদের শিক্ষার হার অত্যন্ত কম, এবং স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। সামাজিকভাবে বিহারিরা বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে কিছুটা বৈষম্য ও বৈষ্ণবতার শিকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের পাকিস্তানপন্থী ভূমিকার কারণে স্থানীয়রা তাদের “বিশ্বাসঘাতক” হিসেবে দেখে। এই ঐতিহাসিক ক্ষোভ আজও বিদ্যমান। ফলে, বিহারিদের সঙ্গে বাঙালিদের মিশ্র বিবাহ বা সামাজিক মেলামেশা খুবই কম। তাদের ক্যাম্পগুলোকে “অন্যদের জায়গা” হিসেবে দেখা হয়, যেখানে বাঙালিরা প্রবেশ করতে অনীহা প্রকাশ করে।অর্থনৈতিকভাবে বিহারিরা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে আছে। ক্যাম্পে বসবাসের কারণে তাদের সম্পত্তির মালিকানাও সীমিত। ফলে, তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে বিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে। এই বৈষম্যের জন্য অনেকে বিহারিদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে চায়, কিন্তু তাদের পাকিস্তানপন্থী মনোভাব এই সহানুভূতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিহারীরা যেভাবে ভেতর থেকে বাংলাদেশকে ধ্বংস করছে

২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারি জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ক্যাম্পে বসবাসকারীদের মধ্যে একটি অংশ, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের কার্যকলাপ মূলত মাদক কারবার, চুরি, ছিনতাই এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গভীর হুমকি হয়ে উঠেছে। বিহারি ক্যাম্পগুলো, যেমন ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, ধীরে ধীরে মাদক কারবারের প্রধান আড্ডায় পরিণত হয়েছে। এই ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাব, শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং অর্থনৈতিক দৈন্যতা তরুণদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর মডেল থানা পুলিশ ২০২৪ সালে শিয়ালবাড়ি মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করেছে, যাদের মধ্যে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা জড়িত ছিল। এই ঘটনায় ১৫ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার হয়, যার আনুমানিক মূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এটি প্রমাণ করে যে, বিহারি ক্যাম্পগুলো মাদকের সরবরাহ চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। মাদকের এই বিস্তার শুধু অপরাধ বাড়াচ্ছে না, বরং নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিদেরকে নেশার দিকে টেনে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে। “প্রথম আলো” (২০২৪) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় ছিনতাই ও চুরির ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের ক্যাম্পগুলো থেকে উদ্ভূত অপরাধীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০ দিনে মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে একাধিক ছিনতাই মামলা রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে বিহারি তরুণদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে দিনদুপুরে ছিনতাই করছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আসাদগেটে একটি ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে বিহারি ক্যাম্পের সদস্যদের সন্দেহ করা হয়। এই অপরাধগুলো শুধু সম্পদ হরণ করছে না, বরং সমাজে অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করছে। বিহারিরা মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তরুণদের মধ্যে নেশার প্রসার ঘটাচ্ছে, যার ফলে অনেক বাংলাদেশি যুবক পড়াশোনা ও কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে। “দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল” (২০১৮)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহারি ক্যাম্পের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করেছে, কিন্তু এটি তাদের ক্ষতিকর প্রভাবকে ন্যায্যতা দেয় না। তারা মাদক বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছে এবং এই অর্থ দিয়ে আরও অপরাধ সংঘটিত করছে, যা বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করছে।নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিরা এই মাদকের ফাঁদে পড়ে নিজেদের জীবন ধ্বংস করছে, যার দায় বিহারি ক্যাম্পের অপরাধীদের উপর বর্তায়। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের ভেতর থেকে একটি নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *